back to top

[the_ad id="407"]

বিজিবির রক্তে ভেজা পার্বত্যঞ্চলের সীমান্ত

মোফাজ্জল হোসেন/খাগড়াছড়িঃ

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের ইতিহাস, যেখানে প্রতিটি পাহাড়, প্রতিটি নদী, প্রতিটি কাঁটাতারে লেগে আছে রক্ত, ঘাম আর প্রতিজ্ঞার স্পর্শ।

একাত্তরের মহান মুক্তিযুদ্ধে বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) পূর্বসূরি ইস্ট পাকিস্তান রাইফেলসের বীরত্বগাথা সবারই কমবেশি জানা। ৭ জন বীরশ্রেষ্ঠর মধ্যে দুজনই এই বাহিনীর। এ ছাড়া আটজন বীর-উত্তম, ৩২ জন বীরবিক্রম এবং ৭৭ জন বীরপ্রতীক খেতাব অর্জন করেন।

স্বাধীনতার পরপর ১৯৭২ সাল থেকে পার্বত্য চট্টগ্রাম যেন নতুন করে জ্বলে ওঠে। পাহাড়ে শুরু হয় সংঘাত। ‘শান্তি বাহিনী’ নামে সশস্ত্র গোষ্ঠী রাষ্ট্রবিরোধী তৎপরতা শুরু করে, আর সেই আগুন ছড়িয়ে পড়ে খাগড়াছড়ি, রাঙামাটি ও বান্দরবানের প্রত্যন্ত অঞ্চলে।

তৎকালীন বিডিআর, বর্তমানে বিজিবি। তখনই বুঝেছিল, যুদ্ধ শেষ হয়নি, শুধু শত্রু বদলেছে।
প্রথম দিকে পাহাড়ের ঢালে, নদীর কিনারে, বাঁশবাগানে রক্তে ভেসে গেছে সীমান্ত।

নায়েক আবদুস সালাম, সিপাহি আব্দুল লতিফ, আব্দুল হালিম মিজু, নায়েক রজব আলী, আমজাদ হোসেন, আবদুর রহিম, মোঃ আজম, আমজাদ আলী। এ রকম ১শ ৮ জন শহীদের নামের একটি দীর্ঘ তালিকা, যাঁরা পাহাড়ে শান্তি প্রতিষ্ঠার জন্য প্রাণ বিসর্জন দিয়েছেন কথিত শান্তি বাহিনীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে।

মায়ানমার সীমান্তে দুটি ঘটনায় শহীদ হয়েছেন ল্যান্সনায়েক মোশারফ হোসেন ও নায়েক মোঃ মিজানুর রহমান। তাঁরা হারিয়ে গেলেও প্রতিরোধ থেমে যায়নি। বিজিবি এক ইঞ্চি মাটিও বিচ্যুত হতে দেয়নি দেশের মানচিত্র থেকে।

স্বাধীন বাংলাদেশের পার্বত্য চট্টগ্রামে বিজিবির মৃত্যুর মিছিল শুরু হয় সিপাহি আব্দুল লতিফকে দিয়ে। ১৯৭২ সালের ১ জুন শান্তি বাহিনীর গুলিতে শাহাদাতবরণ করেন। ওই বছরের ২৬ জুন শান্তি বাহিনীর বিরুদ্ধে অপারেশনে গুলিবিদ্ধ হয়ে শহীদ হন সিপাহি আব্দুল হালিম মিজু।

১৯৭৬ সালে শীতের মৌসুম আসার আগে রাঙামাটিতে শান্তি বাহিনীর গুলিতে শাহাদাতবরণ করেন নায়েক ওবায়েদ উল্লাহ। পেয়েছেন রাষ্ট্রীয় স্বীকৃতি ‘বীরপ্রতীক’, আর পাহাড়ের গায়ে রেখে গিয়েছেন অমরত্বের দাগ। সেই অপারেশনে তাঁর আরো দুই সহযোদ্ধা শহীদ হন।

২৩ ফেব্রুয়ারি ১৯৭৯ সালে দুর্গম সীমান্তে শান্তি বাহিনীর হামলায় শহীদ হন তিনজন, যাঁদের মধ্যে নায়েক আব্দুল আজিজ। তাঁর সেই বীরত্বের জন্য তিনি পান “বীরপ্রতীক” খেতাব।

১৯৮০ সালে সশস্ত্র বিদ্রোহী দমনের অভিযানে নামে মারিশ্যা ব্যাটালিয়নের একটি দল। মেজর সৈয়দ একরামুল হক খন্দকারের নেতৃত্বে দলটি বাঘাইছড়ির কেরাংগাতলীতে শান্তি বাহিনীর সঙ্গে যুদ্ধ করে তাদের একটি ক্যাম্প দখল করে। সে সময় বিপুল পরিমাণ অস্ত্র ও গোলাবারুদসহ বেশ কয়েকজনকে আটক করে তৎকালীন বিডিআর। মেজর একরাম বীরবিক্রম খেতাবে ভূষিত হন। একই ঘটনায় বীরপ্রতীক খেতাব পান সিপাহি মোঃ নূরুল ইসলাম, মোঃ আকতার হোসেন ও মোঃ আব্দুল জলিল।

১৯৮০ সালের ২২ এপ্রিল বান্দরবান জেলার মদক সীমান্ত ফাঁড়িতে অতর্কিত হামলা চালায় শান্তি বাহিনী। গুলিবর্ষণে সুবেদার আজিজুর রহমানসহ ২০ জন ঘটনাস্থলেই নিহত হন। তিন ঘণ্টা ধরে যুদ্ধ চলে, অসীম সাহসিকতার জন্য তাঁকে দেওয়া হয় বীরপ্রতীক খেতাব।

১৯৮২ সালে বরকলের আন্ধারমানিক বিওপিতে ৯ জন সৈনিক শহীদ হন। একই বছরের ১৭ নভেম্বর খাগড়াছড়িতে সীমান্ত চিহ্নিতকরণের দায়িত্বে নিয়োজিত ৭ জন বিজিবি সদস্যকে গুলি করে হত্যা করে শান্তি বাহিনী।

১৯৮৪ সালে কাপ্তাই সীমান্তে ভারত-বাংলাদেশ যৌথ সীমানা চিহ্নিতকরণ কাজ চলার সময় শান্তি বাহিনীর অতর্কিত আক্রমণে শহীদ হন সিপাহি মোহাম্মদ হোসেন।

১৯৮৭ সালের বর্ষার রাতে বরকলের জঙ্গলে অতর্কিত হামলা হয়। নায়েক আলিফ আলী, ল্যান্সনায়েক আব্দুল মালেক, সৈনিক কুদ্দুস আলীসহ ৭ জন শহীদ হন। কেউ মারা যাওয়ার আগমুহূর্তেও রেডিও কল বন্ধ করেননি। শেষবার তাঁরা বলেছিলেন, অবস্থান অক্ষুণ্ন রাখতে হবে।

১৯৮৯ সালের ৬ মে তারিখে পার্বত্য চট্টগ্রামের পানছড়ি ছত্রাছড়ায় শান্তি বাহিনীর গুলিতে সিপাহি হুমায়ুন কবির, সিপাহি এবাদত হোসেন, সিপাহি আবুল হাসান, সিপাহি আবু বকর ও সিপাহি সিগন্যাল দেলোয়ার হোসেন শাহাদাতবরণ করেন।

১৯৯০ সালের জানুয়ারিতে কুকিছড়া ক্যাম্প থেকে ফিরছিল ৩০ জনের টহলদল। জিরার খামারের কাছে অতর্কিতে হামলা হয়। ক্যাপ্টেন আর এ এম নিজামুল ইসলাম খান, হাবিলদার আবুল বাশার, নায়েক আমিনুল হক, ল্যান্সনায়েক নূরে আলমসহ ১২ জন শহীদ হন।

১৯৯১ সালের মার্চে বরকল ছত্রাছড়া ক্যাম্পের বাঁশবাগানে গুলিতে শহীদ হন নায়েক সিরাজুল ইসলাম ভূঁইয়া। ২০০৫ সালের ৩ জানুয়ারিতে শান্তি বাহিনীর গুলিতে বিজিবি সদস্য সিপাহি শাহজাহান আলীর মৃত্যুর ঘটনা ঘটে। ১৯৯১ সালের ডিসেম্বরে রেজুপাড়া বিওপিতে শহীদ হন ল্যান্সনায়েক মোশাররফ হোসেন।

কিন্তু সব গল্পের নায়ক বেঁচে থাকেন না, গৌরবময় মৃত্যুর পরও অমরত্ব পান না বিস্মৃত অনেকেই। অনেকেই ছিলেন অবিবাহিত তরুণ, যাঁদের মা-বাবা জানতেন, ছেলে শহীদ হয়েছেন, কিন্তু তাঁদের মৃত্যুর পর আর কেউ স্মরণ করে না। সেই নামগুলো পড়ে আছে ধুলোমাখা রেকর্ড ফাইলে, স্মৃতির প্রান্তে হারিয়ে যাওয়া একেকটি তারার মতো। আশার কথা, বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ এখন সেই ভুলে যাওয়া নামগুলো নতুন করে খুঁজে আনছে, শহীদদের গল্প ফিরিয়ে দিচ্ছে জাতির হৃদয়ে।

এই ১শ ১০ জনের বাইরেও পাহাড়ে ঝরেছে অনেক তাজা রেজিমেন্টাল প্রাণ। এই সীমান্ত রক্ষার গল্প শুধু সশস্ত্র সংঘর্ষের নয়, এটি রোগ, দুর্ভোগ ও আত্মনিবেদনেরও ইতিহাস। পার্বত্য এলাকায় বহু সৈনিক ম্যালেরিয়ার প্রকোপে প্রাণ হারিয়েছেন। অনেকে টহলরত অবস্থায় জ্বরাক্রান্ত হয়ে পাহাড়েই মৃত্যুবরণ করেছেন। শীতের রাতে পাহাড়ে ঠাণ্ডা হাওয়া আর বৃষ্টি ঝরার মধ্যে টহল দিতে দিতে তাঁরা কাঁপতে কাঁপতে পতাকা রক্ষা করেছেন। তাঁদের মৃত্যুর সংবাদ কেবল ব্যাটালিয়ন ডায়েরিতে লেখা হয়, জাতি জানে না।

এই দীর্ঘ সংগ্রাম জুড়ে বিজিবি মোকাবেলা করেছে বহুরৈখিক শত্রুতার। ভারতের মিজোরাম, নাগাল্যান্ড ও মণিপুর থেকে আসা বিচ্ছিন্নতাবাদী গোষ্ঠী; যেমন—মিজো ন্যাশনাল ফ্রন্ট (এমএনএফ), পিপলস লিবারেশন আর্মি (পিএলএ) কিংবা মায়ানমারের চিন ন্যাশনাল আর্মি (সিএনএ) ও আরাকান আর্মি (এএ)—এদের অস্ত্রের ছায়া ছুঁয়েছিল বাংলাদেশের সীমান্তও। ১৯৭০-৯০ দশকে এই বিদ্রোহীরা পার্বত্য করিডরকে ব্যবহার করত জঙ্গি রুট হিসেবে। বিজিবি তখনই সীমান্তজুড়ে স্থাপন করে অস্থায়ী পোস্ট, রিকনাইস্যান্স টহল আর পাহাড়ে পাহাড়ে নজরদারি।

সময়ের সঙ্গে এই চ্যালেঞ্জ আরো জটিল হয়েছে। মায়ানমারের রাখাইন রাজ্যে আরাকান আর্মির উত্থান, আরসা ও আরএসওর নতুন সন্ত্রাসী ঘাঁটি, কুকি-চিন ন্যাশনাল ফ্রন্টের অনুপ্রবেশ, সঙ্গে জেএসএস আর ইউপিডিএফ তো আছেই। সব মিলিয়ে সীমান্ত এখন বহুমুখী হুমকির মুখে।

বিজিবি ২০২৪ সালের আগস্ট থেকে এ পর্যন্ত বিভিন্ন অভিযানে জেএসএসের ৬ জন, ইউপিডিএফের ২ জন, আরাকান আর্মির ৪ জন, কেএনএফের ১ জন ও আরসার ১৯ জন সদস্যকে আটক করেছে।

উদ্ধার করেছে ৩ টি এসএসবিএল, ১ টি এসএমজি, ৬ টি রাইফেল, ৮ টি পিস্তল ও ৩শ ৫২ রাউন্ড গোলাবারুদ। এসব অভিযান শুধু সীমান্ত সুরক্ষা নয়, বাংলাদেশের সার্বভৌমত্বের সুরক্ষাও নিশ্চিত করেছে।

আজ বর্ডার গার্ড বাংলাদেশ শুধু সীমান্ত পাহারা দেয় না, পাহাড়ের মানুষকেও জুড়ে নিচ্ছে রাষ্ট্রের সঙ্গে। তারা এখন পাহাড়ে বই বিতরণ করছে, চিকিৎসা শিবির বসাচ্ছে, স্থানীয় ভাষায় জনসচেতনতা কার্যক্রম চালাচ্ছে। মাদক, অস্ত্র ও মানবপাচার ঠেকাতে তৈরি করেছে প্রযুক্তিনির্ভর নজরদারি নেটওয়ার্ক।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের ১৮টি ব্যাটালিয়নের ১৫৪টি বিওপি, ৩৮টি বিজিবি ক্যাম্প, ২২টি বিশেষ ক্যাম্প, ১৪টি অস্থায়ী ক্যাম্প পার্বত্য চট্টগ্রামের শান্তি প্রতিষ্ঠায় দিনরাত এক করে দিচ্ছে।

যখন সূর্য ডুবে যায় পাহাড়ের পেছনে, বিওপির টাওয়ারে জ্বলে ওঠে লাল বাতি। সেই আলো নিছক সতর্কতার নয়, বরং এক বিশ্বাসের প্রতীক। এই পতাকা যেমন স্বাধীনতার প্রতীক, তেমনি প্রতিটি প্রহরীর প্রাণে তার রং মিশে আছে।

সর্বশেষ

আরও খবর >

- Advertisement -Newspaper WordPress Theme