back to top

[the_ad id="407"]

পাহাড়ের বুক চিড়ে স্কুলে যাওয়া,গা শিউরে উঠার দিন গুলি!

লিখেছেন: রানা সাত্তার, চট্টগ্রাম

মানুষের জীবনে শৈশব এমন এক অধ্যায়, যার প্রতিটি মুহূর্ত স্মৃতির ক্যানভাসে চিরস্থায়ী রঙে আঁকা থাকে। আমার সেই শৈশব কেটেছে পাহাড়, নদী ও জঙ্গলে ঘেরা এক অনন্য পরিবেশে—চট্টগ্রামের কাপ্তাইয়ে। বয়স তখন মাত্র দশ বছর, পড়ি চতুর্থ শ্রেণিতে। বাবা বনবিভাগের চাকরিতে ছিলেন, ফলে আমাদের সরকারি কোয়ার্টারগুলো ছিল গহীন পাহাড়ের ভেতরে, কাপ্তাই ফরেস্ট অফিস বা খালের মুখের আশেপাশে।

সমতল মানে লোকালয়ে, কাপ্তাই প্রজেক্টের দিকে যেতে হলে টানা দুই-তিন ঘণ্টা হাঁটতে হতো আঁকাবাঁকা পাহাড়ি পথে। তারপরই মিলত স্কুল, বাজার কিংবা দোকান। আমার জীবনের প্রথম স্কুল ছিল কাপ্তাই নিউ মার্কেট প্রাথমিক বিদ্যালয়—যার প্রধান শিক্ষক ছিলেন আমাদের সবার প্রিয় আবুল হোসেন স্যার।

স্বল্প আয়ের বাবার পক্ষে সমতলে বাসা ভাড়া করা সম্ভব ছিল না, তাই সরকারি কোয়ার্টারের পাহাড়ি নিঃসঙ্গ জীবনই ছিল আমাদের প্রতিদিনের বাস্তবতা। কিন্তু সেই বাস্তবতার ভেতরেও ছিল অপরিসীম সৌন্দর্য, ছিল ভয় ও বিস্ময়ের এক মিশ্র পৃথিবী। প্রতিদিন চার-পাঁচটি পাহাড় টপকে প্রায় দশ কিলোমিটার হেঁটে স্কুলে যেতাম। তারপর কর্ণফুলী নদীর ঘাটে এসে মাঝি মণি কাকাকে পাহাড়ি ডাক—“কু কু কু”—দিয়ে ডাকতাম। সেই ডাক ছিল একধরনের সংকেত, যেন জঙ্গলের প্রতিধ্বনি ছুঁয়ে পৌঁছে যায় মাঝির কানে। মাঝি তখন নৌকা নিয়ে পার করিয়ে দিতেন নদী।

চার বছর ধরে, চতুর্থ থেকে সপ্তম শ্রেণি পর্যন্ত, এই কঠিন কিন্তু রোমাঞ্চকর পথ ছিল আমার প্রতিদিনের সঙ্গী। পাহাড়ের বুক চিড়ে চলতে চলতে কখনো গা শিউরে উঠত ভয়েতে, কখনো আবার প্রকৃতির রঙে মন ভরে যেত। সেই ভয়কে জয় করার নায়ক ছিল আমার চারজন বিশ্বস্ত সঙ্গী—আমার চার কুকুর, যাদের আমি ডাকতাম টারজান, টাইগার, বাঘা এবং লালু নামে। ওরা ছিল আমার পাহাড়ি বডিগার্ড, প্রতিদিন সকালে স্কুলে যাওয়ার সময় সামনে থেকে পাহারা দিত।

এক শীতের সকালে, সূর্য ওঠেনি তখনও পুরোপুরি। হাতে খাতা-কলম, পাশে আমার চার যোদ্ধা। হঠাৎ পাহাড়ের ভেতর থেকে এল ঠাস ঠাস করে বাঁশ ভাঙার শব্দ—যেন কারও উপস্থিতির ইঙ্গিত। বুঝতে দেরি হলো না, সামনে বিপদ। একটু এগোতেই দেখি এক বিশাল হাতি বাঁশ খাচ্ছে। চার কুকুর তখন তাকে ঘিরে ফেলেছে, ঘেউ ঘেউ করছে। আমি স্থির হয়ে গেলাম। কিন্তু স্কুলে না গেলে স্যার বকবেন—এই চিন্তায় সাহস সঞ্চয় করলাম।

মনে পড়ল, হাতির মাহুতেরা “পিচ্ছে পিচ্ছে” বা “আউজ্ঞা আউজ্ঞা” বলে হাতিকে চালায়। আমি সাহস করে বললাম, “পিচ্ছে পিচ্ছে!” অবাক হয়ে দেখি, হাতি একটু সরে গেল। আবার বললাম “আউজ্ঞা আউজ্ঞা!”—এবার সে দৌড়ে পালাল। আমি হাঁপ ছেড়ে বাঁচলাম, কিন্তু সেদিন আর স্কুলে যাওয়া হলো না।

এই পাহাড়ি জীবন আমাকে শিখিয়েছে ধৈর্য, সাহস আর প্রকৃতির প্রতি শ্রদ্ধা। আমার চার কুকুরের সঙ্গে সেই দিনগুলোর অভিজ্ঞতা ছিল অবিশ্বাস্য। কখনো ওরা জঙ্গলে হরিণ ধরত, আমি সেই হরিণকে ছয় মাস লালনপালন করেছি। পরে সেটি মারা যায়। আজও মনে হয়, প্রতিটি দিনই যেন আমার জীবনের এক একটি স্মৃতির ফ্রেমে বাঁধা।

সময়ের স্রোতে অনেক বছর কেটে গেছে, তবুও সেই পাহাড়ি সকাল, কর্ণফুলীর ঘাট, কু কু ডাক, কুকুরগুলোর বিশ্বস্ত দৃষ্টি—সবকিছু আজও মনের গভীরে অমলিন। হয়তো একদিন নীরবে সেই স্মৃতিগুলো মনে পড়বে, চোখের কোনে জল গড়িয়ে পড়বে।

জীবনের সেই শিশুকাল, কৈশোর—সব মিলিয়ে আমার নিজের এক “স্মৃতির জাদুঘর”, যেখানে পাহাড়, বন, নদী আর ভালোবাসা—সবকিছু মিলে এক অবিস্মরণীয় গল্প হয়ে আছে।

সর্বশেষ

আরও খবর >

- Advertisement -Newspaper WordPress Theme