ছাত্র অবস্থায় শখের বশে বাবার খামার দেখাশোনা করতেন তিনি। ধীরে ধীরে সেই শখই পরিণত হয় ভালোবাসা ও দায়িত্বে। সময়ের সাথে গড়ে তোলেন নিজস্ব খামার। এখন তিনি আর কেবল ছাত্র নন, সফল একজন খামারী। মাছ, মুরগি ও গরু মিলিয়ে সমন্বিত খামার পরিচালনা করে গড়ে তুলেছেন অনন্য দৃষ্টান্ত। চাকরি না করে অনার্স মাস্টার্স শেষ করে নিজেই হয়ে উঠেন উদ্যোক্তা। এলাকার যুব সমাজের কাছেও তিনি হয়ে উঠেছেন অনুপ্রেরণার প্রতীক।
বলছিলাম চট্টগ্রামের লোহাগাড়া উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের পানত্রিশা গ্রামে সাবেক চেয়ারম্যান সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর ছোট ছেলে রেজাউল বাহার রাজার কথা।
গত ১৯ আগস্ট উপজেলা মৎস্য সপ্তাহ অনুষ্ঠানে মৎস্য খাতে বিশেষ অবদানের স্বীকৃতি হিসেবে সফল উদ্যোক্তার পুরস্কার পান তিনি।
রাজার খামারে এক দিন:
উপজেলার চুনতি ইউনিয়নের পানত্রিশা গ্রামে ২০ একর নিজ পৈত্রিক ও লিজকৃত জায়গায় গড়ে তুলেছে মাছ , গরু ও মুরগির খামার। খামারে ঢুকতে দেখা হয় রেজাউল বাহার রাজার সাথে। এসময় তিনি পুকুরপাড়ে দাঁড়িয়ে হাতে খাবার নিয়ে মাছগুলোকে আহ্বান জানাচ্ছে।
পুকুরের পানিতে খাবার পড়তেই মুহূর্তের মধ্যেই ছুটে আসে রুই, কাতল, তেলাপিয়া ও বিভিন্ন প্রজাতির মাছ। প্রতিদিন নিয়মিতভাবেই তিনি এভাবে মাছের যত্ন নিচ্ছেন। মাছের খাবার, পানি পরিশোধন, ওষুধ ব্যবহারসহ সবকিছুতেই তিনি সর্বোচ্চ যত্নশীল। তার খামারে এখন নানা জাতের মাছ চাষ হচ্ছে। এতে শুধু তার পরিবারই স্বাবলম্বী হয়নি, বরং আশপাশের কয়েকজন বেকার যুবকের কর্মসংস্থানও সৃষ্টি হয়েছে।
মাছের পাশাপাশি গড়ে তুলেছে লেয়ার মুরগি ও গরুর খামার :
শুধু মাছের খামার নয়, পাশাপাশি লেয়ার মুরগি ও গরুর খামার গড়ে তুলে সফল হয়েছেন তরুণ এই উদ্যোক্তা। ছাত্রবস্থায় বাবার খামারের কাজে সহযোগিতা করতে গিয়েই শুরু হয়েছিল তার যাত্রা। বর্তমানে নিজস্ব উদ্যোগে তিনি সমন্বিত খামার পরিচালনা করছেন, যেখানে একসাথে মাছ, মুরগি ও গরুর যত্ন নেওয়া হয়।
তার খামারে রয়েছে পুকুরভর্তি বিভিন্ন জাতের মাছ, আধুনিক শেডে ৭ হাজার লেয়ার মুরগি এবং গোয়াল ঘরে গরু। প্রতিদিন মাছকে খাবার দেওয়া, মুরগির ডিম সংগ্রহ ও গরুর পরিচর্যা—সবকিছুতেই তিনি নিজে তদারকি করেন।বর্তমানে তা পূর্ণাঙ্গ খামারে রূপ নিয়েছে। প্রতিদিন মুরগির ডিম সংগ্রহের পর তা স্থানীয় বাজারে সরবরাহ করেন এবং গরুর দুধও সরাসরি গ্রাহকের কাছে বিক্রি করেন।
এছাড়াও মাছ, লেয়ার মুরগি ও গরুর খামারের পাশাপাশি একই এলাকায় গড়ে তুলেছেন বিভিন্ন ফলের বাগান।
ফলের বাগানের বিভিন্ন ফলের গাছের পরিচর্যা করছেন খামারী রেজাউল বাহার রাজা। খামারের পাশাপাশি গড়ে তোলা এই বাগানে রয়েছে বরই , আম, লিচু, কলা, পেয়ারা, লেবু , পেঁপে , সুপারি ও অন্যান্য ফলের গাছ। প্রতিদিন তিনি নিজে গাছের পানি, পরিচর্যা করতে দেখা যায়। তার এই উদ্যোগ নতুন প্রজন্মকে অনুপ্রেরণা দিচ্ছে নিজস্ব কর্মসংস্থান তৈরিতে।
কথা হয় মুরগির খামারের প্রকল্প ব্যবস্থাপক মাওলানা হাসান মুরাদ, কর্মচারী মফিজ ও আলমগীরের সঙ্গে। তাঁদের কেউ পুকুরে খাবার দিচ্ছেন, কেউ মুরগিকে আধার দেওয়ায় ব্যস্ত, কেউবা গরুর খাবার তৈরি করছেন। তারা জানালেন, খামারে কাজ করেই সংসার চলে তাঁদের। শুধু তারা নন এই খামারে ৪০ জন স্থায়ী কর্মী আছেন। দৈনিক মজুরিতে কাজ করেন।
খামারি রেজাউল বাহার রাজা সি নিউজ কে জানান , লেখা পড়া অবস্থায় শখের বশে আমার বাবার খামার দেখাশোনা করতাম। ধীরে ধীরে সেই শখই পরিণত হয় ভালোবাসা ও দায়িত্বে। চাকরির পেছনে না ছুটে আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি খামারেই ভবিষ্যৎ গড়ব। গত সপ্তাহে উপজেলা মৎস সপ্তাহে আমাকে শ্রেষ্ঠ মৎস্য উদ্যোক্তা হিসাবে পুরস্কৃত করেছে। পুরস্কার পাওয়া আমাকে আরো অনুপ্রেরিত করেছে। আগামীতে মাছ ও মুরগি গরু তিন খাতেই ভালো সম্ভাবনা রয়েছে। ভবিষ্যতে আমার খামারটি আরও বড় করার পরিকল্পনা রয়েছে।
লোহাগাড়া উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা ….বলেন, ‘দেশের ডিম এবং মাংস মাছ ও দুধ চাহিদা পূরণে রাজার খামার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তিনি নিজে উদ্যোক্তা হওয়ার পাশাপাশি কর্মসংস্থানেরও সুযোগ সৃষ্টি করেছেন।
তার উদ্যোগ দেশের অর্থনীতিতে অবদান রাখছে। আমরা তাঁর সফলতা কামনা করি। বেকার তরুণেরা প্রশিক্ষণ নিয়ে এ রকম খামার করলে তাঁদের বেকারত্ব ঘুচবে।’
