অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদবি এক নারী কর্মকর্তাকে অশ্লীল ভিডিও পাঠানোর অভিযোগ উঠেছে রাজশাহী মেট্রোপলিটন পুলিশের (আরএমপি) সাবেক কমিশনার মোহাম্মদ আবু সুফিয়ানের বিরুদ্ধে। এ ঘটনায় ডিআইজি পদমর্যাদার এই পুলিশ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিযোগনামাও জরি করেছে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। অভিযোগের ভিত্তিতে আবু সুফিয়ানকে আরএমপি কমিশনার পদ থেকে সরিয়ে বর্তমানে পুলিশ অধিদপ্তরে যুক্ত করা হয়েছে।
এ ঘটনায় অভিযুক্ত ও ভুক্তভোগী দুই পুলিশ কর্মকর্তার পাল্টাপাল্টি অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত আবু সুফিয়ান জানান, ওই নারী কর্মকর্তার অনেক আইডি। একটি আইডি দিয়ে ভিডিও পাঠানো হলে তার অন্য একটি আইডিতে একই ভিডিও পাঠিয়ে কারণ জিজ্ঞেস করা হয়েছে। আর ভুক্তভোগী ওই নারী কর্মকর্তা বলেন, আমাকে অসংলগ্ন ও অপ্রাসঙ্গিক বার্তা পাঠালে বিভাগীয় নিয়ম অনুসরণ করে বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়। এ বিষয়টি তদন্তাধীন থাকায় অন্য আর কিছু বলতে চাচ্ছেন না।
গত ২৪ নভেম্বর স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে শৃঙ্খলা-১ শাখা বরাবর আবেদন করে এক অভিযোগপত্রে বিষয়টি উঠে এসেছে। সিনিয়র সচিব নাসিমুল গনি স্বাক্ষরিত ওই অভিযোগপত্রে লেখা আছে, ডিআইজি মোহাম্মদ আবু সুফিয়ান আরএমপি কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণের আগে অতিরিক্ত ডিআইজি হিসেবে ট্যুরিস্ট পুলিশে ঢাকায় কর্মরত ছিলেন। সেখানে তার ইউনিটে পূর্বপরিচিত অতিরিক্ত পুলিশ সুপার পদমর্যাদার এক নারী কর্মকর্তা ছিলেন। ওই নারী কর্মকর্তার ট্যুরিস্ট পুলিশে যোগদানের আগে ফেনী জেলায় দায়িত্ব পালনের সময় আবু সুফিয়ানের সঙ্গে পরিচয় হয়েছিল এবং তাদের মধ্যে নিয়মিত মেসেঞ্জারে বার্তা আদান-প্রদান ও কথোপকথন হতো। আবু সুফিয়ানের গ্রামের বাড়ি ফেনীতে হওয়ায় সক্ষতা গড়ে ওঠে।
এরই ধারাবাহিকতায় আবু সুফিয়ান তার ভেরিফায়েড ফেসবুক মেসেঞ্জার থেকে ওই নারী কর্মকর্তাকে আপত্তিকর ও অনাকাঙ্ক্ষিত মেসেজিংসহ গত ১৮ সেপ্টেম্বর একটি আপত্তিকর ও অশ্লীল ভিডিও ক্লিপ পাঠান। পরে এসব আপত্তিকর মেসেজিং ও অশ্লীল ভিডিও তিনি মুছেও ফেলেন, যা পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগের (সিআইডি) ফরেনসিক প্রতিবেদনে প্রমাণিত হয়েছে এবং আবু সুফিয়ান তার জবানবন্দিতে স্পষ্টভাবে স্বীকারও করেছেন বলে অভিযোগনামায় উল্লেখ করা হয়।
অভিযোগপত্রে আরও বলা হয়, আবু সুফিয়ান পুলিশের একটি গুরুত্বপূর্ণ পদে দায়িত্বরত থেকে একজন জুনিয়র নারী সহকর্মীকে অশ্লীল ভিডিও ক্লিপ পাঠানোর বিষয়টি চরম অপেশাদারিত্বের পরিচয় দিয়েছেন, যা নিতান্তই অকর্মকর্তাসূলভ এবং নৈতিকতাবিবর্জিত। তার এই অপেশাদার, অকর্মকর্তাসুলভ, নৈতিকতাবিবর্জিত কার্যকলাপ পুলিশের মর্যাদা ক্ষুন্ন করেছে, যা সরকারি চাকরি বিধিমালা (শৃঙ্খলা ও আপিল) ২০১৮-এর বিধি অনুসারে শাস্তিযোগ্য অপরাধ।
উপযুক্ত অপরাধে আবু সুফিয়ানকে সরকারি কর্মচারী (শৃঙ্খলা ও আপিল) বিধিমালা ২০১৮-এর ৩ (খ) বিধি মোতাবেক ‘অসদাচরণ’-এর দায়ে অভিযুক্ত করা হয়েছে। একই বিধিমালার আবু সুফিয়ানকে কেন চাকরি থেকে বরখাস্ত অথবা অন্য কোনো উপযুক্ত দ- প্রদান করা হবে না, তা অভিযোগ প্রাপ্তির ১০ কর্মদিবসের মধ্যে লিখিতভাবে জানানোর জন্য বলা হয়েছে। পাশাপাশি আত্মপক্ষ সমর্থনে তিনি ব্যক্তিগত শুনানির ইচ্ছা পোষণ করেন কি না, সেটিও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে লিখিতভাবে জানানোর জন্য নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগটির বিষয়ে জানতে একাধিকবার ফোন দেওয়া হলেও তিনি রিসিভ করেননি। তবে গত শনিবার তিনি একটি গণমাধ্যমকে বলেন, আনুষ্ঠানিকভাবে অভিযোগনামাটি এখনো হাতে পাননি। তবে অশ্লীল ভিডিও পাঠানোর কথা স্বীকার করে তিনি বলেছেন, যে ভিডিওটি পাঠানো হয়েছিল সেটি ওই নারী কর্মকর্তাই তাকে পাঠিয়েছেন।
তবে ওই ভুক্তভোগী নারী কর্মকর্তা বলেন, আমি তাকে পূর্বে চিনতাম না। ট্যুরিস্ট পুলিশে আমার পোস্টিং হওয়ার পর দেখা হলে সালাম বিনিময় ছাড়া কখনোই তার সঙ্গে কোনো আলাপ-আলোচনা হয়নি। সরকার পরিবর্তনের পর তিনি (আবু সফিয়ান) আরএমপি কমিশনার হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে একতরফাভাবে আমার কাছে অসংলগ্ন ও অপ্রাসঙ্গিক বার্তা পাঠাতে শুরু করেন। যখন বিষয়টি সম্পূর্ণ অগ্রহণযোগ্য পর্যায়ে পৌঁছায়, তখন আমি নির্ধারিত বিভাগীয় নিয়ম অনুসরণ করে বিষয়টি যথাযথ কর্তৃপক্ষকে অবহিত করি। আমি একজন পেশাদার কর্মকর্তা হিসেবে কখনোই চাইনি যে এই বিষয়টি বিভাগের বাইরে আলোচিত হোক। বর্তমানে বিষয়টি প্রাতিষ্ঠানিক প্রক্রিয়াধীন রয়েছে, তাই এ সম্পর্কে এর বেশি কোনো মন্তব্য করতে চাই না। আমি আমাদের বিভাগীয় নিয়ম-প্রক্রিয়ার ওপর আস্থা রাখতে চাই।
