back to top

[the_ad id="407"]

তরুণের রাজনীতিতে অংশগ্রহণ: কেন এড়িয়ে যাচ্ছে আমাদের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম?

লেখকঃ সাংবাদিক রানা সাত্তার, চট্টগ্রাম

রাজনীতি, যা এক সময় তরুণদের মনোযোগ আকর্ষণ করত, আজকাল একেবারেই তাদের কাছে বিদেশী শব্দে পরিণত হয়েছে। এমনকি যাদের বয়স ৩০’র কোঠায় পৌঁছানোর আগে রাজনীতির প্রতি আগ্রহ বাড়তে পারে—তাদেরও এখন আর আগ্রহ নেই। এমনকি যারা পরিবর্তনের কথা ভাবতে শিখেছে, তারা রাজনীতিকে ‘অস্থিরতা’ আর ‘অনিশ্চিত’ বলে চিহ্নিত করছে। এই দৃশ্যটি, আমরা যতই আঁচ করতে পারি, ততই কঠিন হয় আরও গভীরভাবে বুঝতে পারা যে, কেন তরুণেরা রাজনীতিতে অংশ নিতে আগ্রহী নয়।

১. রাজনীতির প্রতি শূন্য আস্থা

আজকের তরুণরা যে ঘর থেকে বেড়ে উঠছে, সেখানে রাজনীতির সাথে যুক্ত নেতিবাচক ধারণা ও অভিজ্ঞতা বেশ শক্তিশালী। সেলফি, ফেসবুক, ইন্সটাগ্রাম আর ইউটিউবের যুগে—তরুণদের কাছে রাজনীতি হয়ে উঠেছে গ্ল্যামারহীন, ক্লান্তিকর, আর কখনো কখনো বিকৃত। দেশের বৃহত্তম রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে যেসব অস্থিরতা, দ্বন্দ্ব, আর দুর্নীতি চলে—তারা এগুলো থেকে একেবারে দূরে থাকতে চায়। যখন সারা পৃথিবী বদলে যাচ্ছে, তখন আমাদের রাজনীতি এক জায়গায় দাঁড়িয়ে, যেন কিছুই বদলায়নি। ফলস্বরূপ, তরুণদের মনে উঠে প্রশ্ন—”এটা কি শুধুই ক্ষমতার খেলা?”

২. একদমই জড়িত হতে চায় না—তাদের নিজের জীবন যাপনেই সমস্যায়

রাজনীতির উত্তাল স্রোতে পা রাখতে গেলেই তাদের সামনে হাজির হয় আরেকটি বড় চ্যালেঞ্জ—তাদের নিজের জীবন। পেশা, শিক্ষা, পরিবার—তরুণেরা এই তিনটি ক্ষেত্রে এতটা উদ্বিগ্ন, যেখানে রাজনীতির মতো আরেকটা অতিরিক্ত চাপের চিন্তা তারা নিতে চায় না। বহু তরুণের কাছে মনে হয়, “রাজনীতি তাদের স্বপ্নে বাঁধা সৃষ্টি করবে”, বা “এটা হয়তো তাদের পথ অন্ধকার করে দেবে।” ফলে তারা অন্যদিকে চোখ ফেরায়—নিজেদের ক্যারিয়ার, পেশাগত জীবন বা স্বাধীনতার দিকে।

৩. নতুন ধারার রাজনীতির অনুপস্থিতি

তবে, কিছু তরুণের কাছে রাজনীতি এখনও গুরুত্বপূর্ণ, তবে তারা চাইছে এমন একটি রাজনীতি যেখানে ইতিবাচক পরিবর্তন হবে, যেখানে শুধু বক্তৃতা বা চুক্তির কথা নয়, প্রকৃত কাজের ফলাফল দেখানো হবে। তারা চায় এমন রাজনৈতিক দল বা নেতাদের যারা জনগণের সঙ্গে সত্যিই সংযুক্ত থাকবে, যেখানে চিন্তা হয় নতুন ধারার সমাজতন্ত্র বা উন্নয়নের। এই ধরনের রাজনীতি বর্তমান প্রেক্ষাপটে যেন কোথাও হারিয়ে গেছে।

৪. প্রযুক্তি আর সামাজিক যোগাযোগের প্রভাব

আমাদের বর্তমান প্রজন্ম সোশ্যাল মিডিয়ার মাধ্যমে তথ্য সংগ্রহ করে, এবং তাদের চিন্তা-ভাবনা নেটওয়ার্কের মধ্যে অনেক বেশি স্বাধীনতা পাচ্ছে। তাদের কাছে রাজনীতি আর শুধুই নির্বাচনী লড়াই বা সামাজিক আন্দোলন হয়ে দাঁড়িয়েছে। তারা বোঝে, তাদের মতামত একটি টুইট বা একটি পোস্টের মাধ্যমে বিশ্বব্যাপী পৌঁছাতে পারে—তারা এর মাধ্যমে কোনও পরিবর্তন আনতে পারবে। কিন্তু রাজনীতির জটিলতায় তাদের অংশগ্রহণ তারা না চাইলেও এড়িয়ে চলে।

৫. ক্ষুদ্র সমাজে পরিবর্তন, বৃহত্তর রাজনীতি নয়

তরুণদের মধ্যে অনেকেই বিশ্বাস করে যে, বড় রাজনৈতিক দলগুলোর পরিবর্তে তারা নিজস্ব ক্ষুদ্র সমাজে ভালো কিছু করতে চায়—যেটি সরাসরি জনগণের জীবনকে পরিবর্তন করতে পারে। তারা চায় শান্তি, সমাজসেবার কাজ, শিক্ষার উন্নয়ন এবং পরিবেশের যত্ন। এসব বিষয় তাদের কাছে রাজনীতির থেকেও গুরুত্বপূর্ণ—এমনকি তারা মনে করে রাজনৈতিক দলগুলোর মধ্যে অবিশ্বাস এবং অসম্মান তাদের উদ্দেশ্য অর্জনে অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সর্বোপরি,আজকের তরুণদের রাজনীতিতে অংশগ্রহণের অনীহা—একটি গভীর সংকেত বহন করছে। এটি শুধুমাত্র রাজনৈতিক দলের ব্যর্থতার পরিচায়ক নয়, বরং আমাদের সমাজের এক সংকটের অবস্থা। তরুণরা যখন দেখবে যে, রাজনীতি শুধুই নেতিবাচকতায় ভরা, তারা কীভাবে নিজেদের ভবিষ্যত গড়বে? কিন্তু এই অনীহার মাঝেও একটি মর্মস্পর্শী সত্য লুকিয়ে রয়েছে—তারা অপেক্ষা করছে নতুন, উদ্ভাবনী ধারার নেতৃত্বের জন্য, যা তাদের স্বপ্ন ও বিশ্বাসের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ হবে।

তবে, প্রশ্ন থেকেই যায়—তরুণরা যদি রাজনীতি থেকে দূরে থাকে, তবে সমাজের সঠিক পরিবর্তন আসবে কিভাবে? তাদের আগ্রহ ফিরিয়ে আনার দায়িত্ব কেবল রাজনৈতিক দলের নয়, বরং আমাদের সবার—কোনো একদিন রাজনীতির সঙ্গেও প্রেম হবে, আবার নতুন কোনো তরুণের মধ্যে!

সর্বশেষ

আরও খবর >

- Advertisement -Newspaper WordPress Theme